নৌকার ভুয়া তালিকায় উত্তপ্ত নির্বাচনের ‘বাজার’


হাসিবুর রহমান,সেন্ট্রাল ডেস্ক | Published: 11:17 AM, September 07, 2018

IMG

আগামী নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীদের মনোনয়ন দিতে সব ধরনের বিচার-বিশ্লেষণ, জরিপ ও পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী সম্ভব সকল উপায়ে খোঁজ খবর নিচ্ছেন প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়ার ব্যাপারে।

এছাড়া বিএনপির নির্বাচনে আসা বা না আসার উপরও নির্ভর করছে কারা মনোনয়ন পাবেন।

এটিই এখনও পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের কাছ থেকে পাওয়া প্রকাশ্য এবং গোপন ঘোষণা।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ একাধিক নেতা এও জানিয়েছেন যে, মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। সেক্ষেত্রে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের পরামর্শ নিতে পারেন।

সে কারণেই প্রার্থীদের খসড়া তালিকা প্রণয়ণে সব ধরনের বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ করছেন স্বয়ং আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিটি আসনে একাধিক প্রার্থী ঠিক করে রেখেছেন দলীয় সভানেত্রী। অবস্থা বুঝেই তিনি ব্যবস্থা নেবেন। কারণ প্রতিটি আসনে এবার দলটি থেকে গড়ে ১৩ জন করে মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন।

দলীয় সূত্র জানায়, এখনও মাঠ জরিপ অব্যাহত রয়েছে। শীর্ষ পর্যায়ের নীতি-নির্ধারক যে কয়েকজন নেতার মনোনয়ন প্রশ্নাতীত, তাদের ক’জন ছাড়া বাকি কারো বিষয়েই কেউ কোনো তথ্য এখনও জানেন না। এমনকি মন্ত্রিত্বে রয়েছেন— এমন অনেকেই এখনও জানেন না তাদের মনোনয়ন নিয়ে সবশেষ সিদ্ধান্ত কী।

তারা বলছেন, একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল দশম সংসদ নির্বাচনের আগে। তার আগের সরকার মন্ত্রী ছিলেন এমন চয়জন নেতা সেবার মনোনয়নই পাননি। এটাই একটি গণমুখী দলের চরিত্র। যারা দলের নাম ব্যবহার করে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন, অন্যায়-অপরাধে সহায়তা করেছেন তারা তো আর মনোনয়ন পাওয়ার আশা করতে পারেন না।

তবে প্রায় ৬ মাস আগে থেকেই সংবাদমাধ্যমে মনোনয়নের একাধিক তালিকা ঘুরছে। যেসব তালিকা আসছে, একেবারেই মনগড়া, ভুয়া তালিকা ও উদ্দেশ্য প্রনোদিত বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা। এর সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই।

আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য ও দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য রাশেদুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রথম সারির শীর্ষ পর্যায়ের কিছু নেতার মনোনয়ন এমনিতেই চূড়ান্ত থাকে। কেবল সেগুলোর কথাই বলা যায়। এর বাইরে কে কে নির্বাচনে নৌকার টিকেট পাবেন, তা বলার সময় এখনও হয়নি। এখনও কিছু চূড়ান্ত হয়নি।’

রাশেদুল আলম আরও বলেন, ‘জরিপ ও প্রাপ্ত জরিপের তথ্য পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত নির্বাচনি কৌশল হিসেবে প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার প্রকাশ্যেই বলেছেন, প্রার্থী যাকেই করা হোক, সবাইকে তার পক্ষেই কাজ করতে হবে। প্রার্থী পছন্দ না হলেও বিদ্রোহ করা যাবে না। কারণ তিনি দলের জন্য যাকে ভাল বলে মনে করবেন তাকেই মনোনয়ন দেবেন।

মনোনয়ন দেয়ার ব্যাপারে একটি সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলে খোদ প্রধানমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন, ‘শত ফুল ফুটতে দিন। সময় হলে দেখা যাবে কাকে মনোনয়ন দেয়া হবে।’

আগামী ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে অক্টোবরে তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। এরই মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদাও ডিসেম্বরের শেষে অথবা জানুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেছেন।

সে সময়কে সামনে রেখে নির্বাচেনের  প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। তফসিল ঘোষণা হওয়ার পরে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

তবে এতো আগে থেকেই কেন প্রার্থী তালিকা গণমাধ্যমে ঘুরছে তার জবাবে দলটির প্রচার সেলের একজন নেতা বলেন, মূল ধারার দায়িত্বশীল কোন গণমাধ্যমেই কোন তালিকা প্রকাশিত হয়নি। যা হয়েছে সবই ভুঁইফোড় পত্রিকা বা অনলাইনে। যেহেতু প্রার্থী কাকে করা হবে সেটা নিয়ে সবার মাঝেই ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে তাই তারা কাটতি বাড়ানোর জন্য এসব গুজব ছড়াচ্ছেন। চূড়ান্ত প্রার্থী কারা হবেন তা একমাত্র নেত্রী ছাড়া কেউই জানেন না।

এর আগে তিন দফায় সারাদেশের তৃণমূলের নেতাদের গণভবনে ডেকে বিশেষ বর্ধিত সভায় জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে সারাদেশে একাধিক জরিপ চালানো হয়েছে। আগামী আগস্টে আরেকটি জরিপ কার্যক্রমের ফল দলীয় সভাপতির কাছে জমা হবে। তার আগে মনোনয়নের বিষয়ে অনুমান পর্যন্ত করা যাচ্ছে না।

গত ৫ জুলাই সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ ভবনের নবম তলায় সরকারি দলের সম্মেলন কক্ষে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের বৈঠকে দলীয় এমপিদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেছেন, দলের ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন করুন, যেখানে যতটুকু দূরত্ব আছে তা দ্রুতই ঘুচিয়ে ফেলুন।

ওই বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রত্যেক এমপি-মন্ত্রীর জরিপ রিপোর্ট আমার কাছে আছে। জরিপ ও তৃণমূলের মূল্যায়নের মাধ্যমে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তার পক্ষেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। আগামী নির্বাচনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ— যেভাবেই হোক বিএনপি নির্বাচনে আসবে। তাই আগামী নির্বাচন অত্যন্ত কঠিন হবে। সেভাবেই নির্বাচনের জন্য সবাইকে প্রস্তুতি নিতে হবে।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ড ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ গণমাধ্যশকে বলেন, ‘আমাদের জানা মতে, এমন কোনো প্রার্থী তালিকা এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি। আশা করছি, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘মনোনয়ন নিয়ে যেসব খবর হচ্ছে সেগুলো ভিত্তিহীন, ভুয়া ও বানোয়াট। কোনো বাস্তবতা নেই। অনুমানের ভিত্তিতে করা হয়েছে।’