ঐক্যফ্রন্ট নাকি ‘বিএনপিফ্রন্ট’?


রাজনৈতিক প্রতিবেদক,সেন্ট্রাল ডেস্ক | Published: 06:29 PM, November 07, 2018

IMG

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ছাড়া সব বিরোধী দলকে একজোট করে অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবিতে যুগপৎ কর্মসূচির প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এরই মধ্যে নবগঠিত এই রাজনৈতিক জোটটি ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে দুটি সংলাপ করেছেকিন্তু এরই মধ্যে এই জোটে শোনা যাচ্ছে ভাঙনের সুর। বৃহত্তম শরিক দল হিসেবে বিএনপি একচেটিয়া এই জোটকে নিয়ন্ত্রণ করছে— এমন অভিযোগে জোটের অনেক নেতাই বলছেন, ঐক্যফ্রন্ট ঢুকে গেছে বিএনপির পকেটে! শুধু তাই নয়, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ঐক্যফ্রন্ট ভেঙেও যেতে পারে বলে আশঙ্কা জোট নেতাদের।

দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার পর গত ১৩ অক্টোবর প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। শুরুতেই অবশ্য একটি ধাক্কা খায় ঐক্যফ্রন্ট। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর (বি. চৌধুরী) নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা চললেও ওই সময় ঐক্যফ্রন্টে স্থান হয়নি বি. চৌধুরী কিংবা তার দল ও জোটের। বরং যুক্তফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে এসেই ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা হয়ে ওঠেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। অন্যদিকে, ঐক্যফ্রন্ট আত্মপ্রকাশের সময়ই ছিল বিএনপির সরব উপস্থিতি।

ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বলছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দাবি-দাওয়া নিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের আন্দোলনে সাত দফা দাবি তোলা হয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে। লক্ষ্য ছিল, ঐক্যফ্রন্ট বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করবে। এর জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বাদে সব রাজনৈতিক দলকেই অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল। কথা ছিল, কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম থেকে ঘোষণা করা কর্মসূচি পালন করবে সব রাজনৈতিক দল। পাশাপাশি তারা নিজেরাও নিজেদের মতো কর্মসূচি-আন্দোলন চালিয়ে যাবে।

ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ অনেক নেতার অভিযোগ, সেই লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে এখন ঐক্যফ্রন্ট বিএনপির দাবি-দাওয়া পূরণে কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঐক্যফ্রন্ট এখন কোনো কর্মসূচি পালন করলেও সেখানে বিএনপির কথাই বলা হচ্ছে বেশি, প্রাধান্য পাচ্ছে বিএনপির দাবি-দাওয়া। এ নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ক্ষোভও তৈরি হয়েছে।

সূত্রগুলো বলছে, এর মধ্যে গতকালের (৬ নভেম্বর, মঙ্গলবার) ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশে ড. কামাল হোসেনও বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। তবে ওই সমাবেশে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের প্রাধান্য দেওয়ায় সমাবেশ শেষে তিনিও ক্ষোভ জানিয়েছেন।

এদিকে, গণফোরামের কেন্দ্রীয় একজন নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, মঙ্গলবারের সমাবেশে কোনো গণফোরাম নেতা ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের লিয়াজোঁ কমিটির কাউকে মাইকই ধরতে দেওয়া হয়নি। 

এমনকি বিএনপির দাবিকে গুরুত্ব দিতে ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবি নিয়ে বক্তৃতা করতেও নিষেধ করা হয়। এই সমাবেশে একচেটিয়া প্রাধান্য ছিল বিএনপির। সমাবেশে বক্তাদের দাবিতেও বারবার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি, তথা বিএনপির মূল দাবিই উঠে এসেছে, ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবি নয়। ওই সমাবেশেই এক পর্যায়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের চেয়ারম্যান কাদের সিদ্দিকী বলেন, আপনারা বিএনপির কথা ভুলে যান। বিএনপির কথা ভুলে না গেলে আমরা আগাতে পারব না। কারণ সরকার বিএনপির ওপর ক্ষুব্ধ।

কেবল মঙ্গলবারের সমাবেশ নয়, ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর থেকেই এই জোটে প্রভাব বিস্তার করছে বিএনপি। ঐক্যফ্রন্টের শরিক কোনো দলই জনসমর্থনে তেমন এগিয়ে নেই। তাদের নেতাকর্মী-সমর্থকদের সংখ্যাও হাতেগোনা। একমাত্র বিএনপিরই সেই অর্থে ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলোর মধ্যে। ঐক্যফ্রন্টের এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বিভিন্ন কর্মসূচিতেও উপস্থিতিতে ছিল বিএনপি সমর্থকদেরই প্রাধান্য। এ কারণেই জোটে বিএনপি প্রভাব রেখে আসছে শুরু থেকেই।

এসব বিষয় নিয়ে গত ২০ অক্টোবর এক বৈঠকে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের মধ্যে তুমুল তর্ক-বিতর্ক হয় বলে জানা গেছে জোট সূত্র থেকে। শুধু তাই নয়, জোট নেতা ড. কামাল হোসেন বরাবর সার্বিক বিষয় তুলে ধরে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব আ ব ম মোস্তফা আমীন চিঠিও দেন। ড. কামাল হোসেনের দফতর সূত্র সারাবাংলাকে ওই চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সূত্রটি বলছে, ঐক্যফ্রন্টকে কেন বিএনপি নিয়ন্ত্রণ করবে বা ঐক্যফ্রন্ট কেন বিএনপির সঙ্গে সুর মিলিয়ে কথা বলবে— সে বিষয় নিয়ে চিঠিতে ক্ষোভ জানানো হয়েছে।

জোট সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এ পরিস্থিতির জের ধরে ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে গেলেও তাতে অবাক কিছু নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আ ব ম মোস্তফা আমীন বলেন, ঐক্যফ্রন্ট ভাঙবে কি না, তা আমি জানি না। তবে আমি আমার অবস্থান ওই চিঠিতেই জানিয়েছি। আমি অসাম্প্রদায়িক মানুষ। আপাতত তাদের (ঐক্যফ্রন্ট) থেকে একটু দূরে এসেছি।

দূরে থাকার কারণ জানতে চাইলে মোস্তফা আমী বলেন, আমাদের কথা ছিল যুগপৎ আন্দোলন করার, যুগপৎ কর্মসূচি ঘোষণা করার। কিন্তু এখানে তো সবাই বিএনপির কথাই বলছে। আমি তো ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়েছি ঐক্যফ্রন্টের দাবি আদায়ের আন্দোলন করতে, বিএনপির দাবি আদায়ের জন্য তো এখানে আসিনি।

সূত্র: সারাবাংলা