আত্মনিবেদিত এক ক্রিকেটারের প্রতিমূর্তি মাশরাফি


, | Published: 10:08 PM, January 08, 2019

IMG

কে বলে তার বয়স হয়েছে? মাশরাফি বুড়িয়ে যাচ্ছেন? তার এখন আর ক্রিকেটে মনোযোগ নেই? সংখ্যায় খুব কম হলেও কেউ কেউ ফোড়ন কাটেন। তীর্যক কথা-বার্তাও বলেন, ‘মাশরাফি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। নির্বাচনে সক্রিয় থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। এখন আর ক্রিকেট নিয়ে তার তেমন কোন উৎসাহ নেই।’

তাদের ওইসব কথা যে ভিত্তিহীন, অসাঢ় এবং অসত্য, সেটা দেখিয়ে দিলেন মাশরাফি। তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য হয়েছেন সত্য, নিজ এলাকা নড়াইলের উন্নয়ন এখন তার ধ্যান-জ্ঞান, সেটাও সত্য; কিন্তু তারচেয়েও বড় সত্য, ক্রিকেটার মাশরাফি এখনো শতভাগ সিরিয়াস। ক্রিকেটের প্রতি তার ভালবাসা এবং আত্মনিবেদন একটুও কমেনি। বরং মধ্য তিরিশে দাড়িয়ে সংসদ সদস্য হয়েও ক্রিকেটার মাশরাফির পারফরমেন্স আরও উজ্জ্বল।

আজ সন্ধ্যায় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের বিপক্ষে তার ক্ষুরধার বোলিং সে কথাই জানান দিল আরও একবার। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের আগে সমালোচকরা নেতিবাচক কথার খই ফুটিয়েছেন। মাশরাফির মনোযোগ এখন রাজনীতির মাঠে। নির্বাচনে। ক্রিকেটে তার দৃষ্টি নেই।

কিন্তু গত ৯ ডিসেম্বর এই শেরে বাংলায় তিন ম্যাচের প্রথম দিন মাঠে নেমে ম্যাচ জেতানো বোলিং নৈপুণ্য উপহার দিয়ে সমালোচকের মুখে ‘কুলুপ’ এঁটে দিতে বাধ্য করেছিলেন নড়াইল এক্সপ্রেস। ওই ম্যাচে ১০ ওভারে ৩০ রানে ৩ উইকেটের পতন ঘটিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ২০০’র নিচে (১৯৫) বেঁধে রাখতে রাখেন অগ্রণী ভুমিকা রাখেন। ক্যারিবীয় বধের মিশনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে ৫ উইকেটের জয়ের স্বার্থক রূপকার হিসেবে ম্যাচ সেরা হন মাশরাফি।

সংসদ সদস্য হয়ে বিপিএল খেলতে নেমে প্রথম দিন চিটাগং ভাইকিংসের বিপক্ষে ৯৮ রানের মামুলি পুঁজি থাকার পরও বল হাতে সাধ্যমত চেষ্টা করে ৪ ওভারে ২৪ রানের ২ উইকেট দখল করেন। তাতে জয়ের দেখা না মিললেও খেলা গড়িয়েছে শেষ ওভার অবধি।

আর আজ স্টিভেন স্মিথ, তামিম ইকবাল, এভিন লুইস, শোয়েব মালিক ও আফ্রিদির কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের বিপক্ষে প্রথম বিগ ম্যাচে বল হাতে দূরন্ত-দুর্বার মাশরফি। দেশি ও বিদেশি এক ঝাঁক নামি-দামি ও পরিণত ক্রিকেটারে সাজানো কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের বিপক্ষে হাই ভোল্টেজ ম্যাচে পারফরমার মাশরাফি সবার সেরা।

এমন বড় ম্যাচে দল জেতাতে যেমন আত্মনিবেদন দরকার, পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝে যে বোলিংটা দরকার ও কাজে দেবে- তা মাশরাফির খুব ভাল জানা। শেরে বাংলার পিচ সন্ধ্যার পর শিশিরে ভিজে একটু সহজ হয়ে যায়। বল ব্যাটে আসে। এখানে ব্যাটসম্যানকে অফ ও লেগ স্ট্যাম্পের বাইরে জায়গা দেয়া যাবে না। শর্ট বল করলে মার খেতে হবে। আবার খুব ওপরেও বল ফেললে লাভ হবে না। তাতে মার খাবার সম্ভাবনা থাকবে।

এ বোধ ও উপলব্ধি থেকে মাশরাফি ঠিক অফ স্ট্যাম্প ও তার আশপাশে ঠিক ড্রাইভিং জোনের বাইরে বল করলেন। উদ্দেশ্য ছিল ব্যাটসম্যানদের সামনের পায়ে এনে ড্রাইভ খেলানো। আর তাতেই সাফল্য ধরা দিল।

তিন বাঁ-হাতি এভিন লুইস, তামিম ইকবাল এবং ইমরুল কায়েসের বিপক্ষে অফ স্ট্যাম্পের আশপাশে খুব ভাল জায়গায় বল ফেলে কুমিল্লার ব্যাটিং মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিয়েছেন মাশরাফি। ওই তিন টপ অর্ডারের সাথে কুমিল্লা ক্যাপ্টেন স্টিভেন স্মিথকেও আউট করেছেন রংপুর ক্যাপ্টেন।

তার টানা ওভার ছিল স্বপ্নীল এক স্পেল। প্রথম ওভারে এভিন লুইসের হাতে একটি মাত্র বাউন্ডারি খাওয়া, পয়েন্ট দিয়ে সপাটে ফ্ল্যাশ করে। দ্বিতীয় ওভারেই মাশরাফি ম্যাজিক শুরু। ওই ওভারের প্রথম বলে তামিমকে পরাস্ত করা। অফ স্ট্যাম্পের বাইরে খুব ভাল জায়গায় পিচ ফেলা। সামনের পায়ে ঝুঁকে পড়া তামিমের ব্যাট ফাঁকি দিয়ে কিপার মিঠুনের গ্লাভসে। তাতেই খানিক বিব্রত তামিম।

আউট হলেন মাশরাফিকে ড্রাইভ করতে গিয়েই। তামিম যতটা ওপরে ভেবে ড্রাইভ খেলেছেন, বল তত ওপরে ছিল না। তাই মাঝ ব্যাটে না লেগে লাগলো একটু ওপরের দিকে। তাতেই মিড অনে ক্যাচ।

দ্বিতীয় শিকার ইমরুল কায়েস- অফ স্ট্যাম্পের ঠিক বাইরের বলকে চালাতে গেলেন। বল বাতাসে ভেসে পয়েন্ট আর ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টের মাঝামাঝি জায়গায় উচুঁ হয়ে উঠলো। সেই বল পিছনে দৌড়ে অসামান্য দক্ষতায় ধরে ফেললেন রবি বোপারা। একই ওভারে মাত্র দুই বল পর ফিরিয়ে দিলেন এভিন লুইসকেও।

চেপে বসা মাশরাফিকে মেরে নিজেকে চাপমুক্ত করতে চেয়েছিলেন লুইস। লং অনের ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকাতে গেলেন। বল অনেকটা আকাশে ভেসে চলে গেল সোজা লং অনে দাড়িয়ে থাকা নাজমুল অপুর হাতে। একদম সীমানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নাজমুল অপু বলের ওপর চোখ রেখে ঠিক ফুটখানেক সামনে থেকে তা ধরে ফেললেন। অনেক সময় ওইসব জায়গায় ক্যাচ ধরার পর শরীরের ভারসাম্য ঠিক থাকে না। পা গিয়ে দড়ির ওপর লাগে। নাজমুল অপুর নজর ছিল সেদিকে। বল দড়িতে স্পর্শ করেনি। ক্লিন ক্যাচে বিদায় লুইসের।

মাশরাফির চতুর্থ শিকার কুমিল্লার ক্যাপ্টেন স্টিভেন স্মিথ। সেটা তার শেষ ওভারের চতুর্থ বলে লেন্থ ডেলিভারিতে। স্লোয়ার ছিল। স্মিথ অফ ড্রাইভ খেলে ফেলেন আগেই। বল চলে যায় মিড অফ ফিল্ডার ফরহাদ রেজার হাতে। ওই ওভারে শুধু প্রতিপক্ষ অধিনায়ক ও বিশ্ব ক্রিকেটের উজ্জ্বল নক্ষত্র স্মিথকে ফিরিয়ে দেয়াই নয়, মেডেন উইকেটও নিলেন মাশরাফি।

আর এরই সাথে তার টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ার সেরা বোলিং ফিগারটাও হয়ে গেল। বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে এর আগে তার সেরা বোলিং ছিল ১৯ রানে ৪ উইকেট। সেটা ২০১২ সালের ২১ জুলাই আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বেলফাস্টে ৪ ওভারে ১৯ রানে ৪ উইকেটের পতন ঘটিয়ে হয়েছিলেন ম্যাচ সেরা। বলার অপেক্ষা রাখে না লাল সবুজ জার্সি গায়ে ৫৪ টি টোয়েন্টি ম্যাচে মাশরাফির উইকেট ৪২টি। চার উইকেট ওই একবারই।

শুধু জাতীয় দলের পক্ষেই নয়, আজ বিপিএলেও নিজের সেরা বোলিং করেছেন মাশরাফি। বিপিএলে এটা তার ৬৩ নম্বর ম্যাচ। এর আগে কখনো চার উইকেট পাননি। আগের সেরা ম্যাচ ফিগার ছিল ৩/১৬। ২০১৬ সালের ২ ডিসেম্বর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের হয়ে খুলনা টাইটান্সের বিপক্ষে ৪ ওভারে ১৬ রানে তিন উইকেটের পতন ঘটিয়েছিলেন। সেটাই ছিল এতকাল তার বিপিএলে সেরা বোলিং। জাতীয় সংসদ সদস্যের তকমা গায়ে মাঠে নেমে আজ তাও ছাড়িয়ে গেলেন নড়াইল এক্সপ্রেস। দিনকে দিন নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার পালায় কোথায় গিয়ে থামবেন এ ক্রিকেট অন্তঃপ্রাণ পারফরমার? সেটাই এখন দেখার।