খালেদার মুক্তির জন্য জাতিসংঘে যাচ্ছে বিএনপি


রাজনৈতিক প্রতিবেদক,সেন্ট্রাল ডেস্ক | Published: 08:50 PM, February 27, 2018

IMG

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সহায়তা চায় বিএনপি। সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে আগামী নির্বাচন সম্পন্ন করতে সরকারের ওপর 'চাপ সৃষ্টি' করার আহ্বান জানিয়ে আজকালের মধ্যেই জাতিসংঘকে চিঠি দিচ্ছে দলটি। ঢাকাস্থ জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি মিয়া শেপু’র মাধ্যমে মহাসচিব আন্তোনিও বরাবর আনুষ্ঠানিকভাবে এ চিঠি পাঠাচ্ছে বিএনপি। দলের শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

চিঠির খসড়ায় বলা হয়েছে, বিএনপি এবং দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ 'গভীর ষড়যন্ত্র' করছে। এ ছাড়া এতে দাবি করা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে 'মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক' মামলায় সাজা দিয়ে কারারুদ্ধ করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত এ চিঠিতে 'বিশ্বের অভিভাবক' হিসেবে বাংলাদেশে গণতন্ত্র 'পুনঃপ্রতিষ্ঠা' করতে 'মধ্যস্থতাকারী'র ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে সংকট নিরসনে সরকারকে প্রধান বিরোধী দলসহ অন্য দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসতে চাপ দেওয়া এবং একজন প্রতিনিধি পাঠানোর অনুরোধ করবে দলটি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একজন নীতিনির্ধারক নেতা গতকাল বলেছেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জাতিসংঘকে অবহিত করে চিঠি দেবেন তারা। চিঠিতে কী কী বিষয় উল্লেখ করা হচ্ছে- জানতে চাইলে ওই নেতা বলেন, আগামী নির্বাচন, খালেদা জিয়ার কারাদণ্ডসহ সার্বিক পরিস্থিতি থাকছে। কবে নাগাদ চিঠি দেওয়া হবে- প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আজ রোববার চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। সূত্র জানায়, জাতিসংঘের মহাসচিবকে চিঠি দিতে বেশ কয়েক দিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এ নিয়ে দলের আন্তর্জাতিক উইং নিজেদের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক করে চিঠির একটি খসড়া প্রণয়ন করেছে।

বৃহস্পতিবার দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে খসড়া চিঠিতে কিছু সংযোজন ও বিয়োজন করা হয়। একই সঙ্গে 'বিশেষ বার্তা'বাহকের মাধ্যমে কারারুদ্ধ দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও টেলিফোনে লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শ নিয়েছে স্থায়ী কমিটি। বর্তমানে চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পরামর্শ নিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির নেতারা সমন্বয়ের মাধ্যমে দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে দল পরিচালনা করছেন। এ লক্ষ্যে স্থায়ী কমিটির নেতারা ঘন ঘন চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠক করছেন। স্থায়ী কমিটির যাবতীয় সিদ্ধান্ত দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমন্বয় করছেন।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান এবং আন্তর্জাতিক উইংয়ের সদস্য সচিব ড. আসাদুজ্জামান রিপনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তারা।

বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, বিগত জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জাতিসংঘের মহাসচিবকে লেখা এ চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার কথা বলে 'একতরফা' নির্বাচন করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দ্রুত সময়ের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেওয়ার কথা ছিল। ওই 'একতরফা নির্বাচনে' বিএনপিসহ দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি।

একই সঙ্গে তারা ওই নির্বাচন বর্জন করে আন্দোলনের টানা কর্মসূচি পালন করছিলেন। তবে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনুরোধে দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন নির্বাচনের আশ্বাসে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। ১৫৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের নেতারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। 'ভোটারবিহীন' ওই নির্বাচন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ ওয়াদার বরখেলাপ করে বিগত চার বছর 'অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল' করে আছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে রাজপথে কোনো কর্মসূচি পালন করতে দিচ্ছে না। দলের কেন্দ্রীয় থেকে তৃণমূল পর্যায়ে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে 'মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক' মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, চিঠিতে আরও বলা হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দল আবারও একটি 'একতরফা' নির্বাচন করার 'নীলনকশা' প্রণয়ন করেছে। ওই নির্বাচনে বিএনপি এবং দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বাইরে রাখতে চান তারা।

সূত্র জানায়, চিঠিতে আদালতের ওপর সরকারি দল প্রভাব বিস্তার করছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার মামলার বিচার চলাকালেই প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা 'সাজা হবে' বলে আগাম বক্তব্য দিয়েছেন। এতে আদালত প্রভাবিত হয়েছে। একই সঙ্গে 'কিছু সত্য কথা' বলায় সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে বাধ্যতামূলকভাবে পদত্যাগ করতে হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হচ্ছে। দেশে ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকার আজ চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ থাকছে চিঠিতে।

সূত্রমতে, চিঠিতে বলা হয়, জাতিসংঘের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন না করে তাহলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আবারও একটি 'একতরফা' নির্বাচন করার চেষ্টা করবে।

সূত্র জানায়, এ পরিস্থিতিতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সরকারকে দ্রুত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসাতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ প্রয়োজন বলে মনে করে বিএনপি। চিঠিতে বলা হচ্ছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে ভোটের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হলে 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' হবে না।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের আগেও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য জাতিসংঘের মধ্যস্থতা চেয়েছিল বিএনপি। ওই সময় বিএনপির আহ্বানে সাড়া দিয়ে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বান কি মুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করেছিলেন। সমঝোতা করতে জাতিসংঘের মহাসচিবের 'বিশেষ দূত' ও সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো ঢাকা এসেছিলেন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেছিলেন। তবে সমঝোতায় ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান তারানকো।